খবরটি শুনুন
অডিও সংস্করণ
গলাজলে নেমে হাতড়ে মরা মাছ, মুরগি, ছাগল খুঁজে চলেছে একদল লোক। মুখে মাস্ক আছে কারও, কারও বা গামছা বাঁধা। ভিজে গেছে। হাতের গ্লাভসও ভিজে গেছে। কারও কারও মাথায় বাঁধা টুপিও ভেজা। তার উপরে এই করোনা মহামারী কালে একসঙ্গে এতজন মিলে নোংরা জলে নেমে কাজ করা! দূরে দাঁড়িয়ে দু’দণ্ড দেখলেও যেন অস্বস্তি হয়। অসহায় লাগে।
“কিন্তু উপায় কী!”—বললেন সুহাস মিস্ত্রি।
সুহাস সুন্দরবনের এক ‘সৈনিক’। হ্যাঁ, সৈনিকই বটে, এই শ্বাপদসঙ্কুল নোনা জলের দেশ রক্ষা করার জন্য যাঁদের জীবনের মায়া নেই, ঘড়ির কাঁটার পরোয়া নেই, খিদে-ঘুমের ক্লান্সি নেই, তাঁদের আর কী বলা যায়! ঘুরে দাঁড়ানোই সুন্দরবনের জরুরি অভ্যেস। প্রতিকূল পরিবেশে এমনই হয়। মানুষ পরিবেশ প্রকৃতিকে নিয়ে বাঁচে। আবার প্রকৃতি যখন রুদ্ররূপ নেয়, তখন অক্লান্ত পরিশ্রম করে ফের ঘুরে দাঁড়ায়। সুহাস মিস্ত্রিরা সেই ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ের কারিগর। যাঁদের ছাড়া এত বড় লড়াই জেতা সম্ভব হতো না এত দিন ধরে, বারেবারে। আয়লা হোক বা বুলবুল, বা তার মাঝে ঘটে যাওয়া আরও অসংখ্য ছোট-বড় ঝড়—সব সময়েই সবার আগে কোমর বেঁধে বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তাঁরা। নিজের ঘরের পরোয়া করেননি কেউ, সুন্দরবনের ভালর জন্য। তাঁরা গ্রাম পঞ্চায়েতের কর্মী, তাঁরা সুন্দরবনের অক্লান্ত যোদ্ধা। অঞ্চল-ওয়ার্কার বলেই তাঁদের চেনেন স্থানীয় মানুষ।
বছর আঠাশের সুহাস মিস্ত্রি যদিও আগে বাবার সঙ্গে জঙ্গলে যেতেন মাছ-মধু সংগ্রহের কাজে। বছর তিনেক হল কাজ পেয়েছেন পঞ্চায়েতে। নিচু তলার কর্মী হিসেবে এ কাজ সুহাসের মনের মতো নয়। কিন্তু এই বিপদে এই কাজের গুরুত্ব বুঝেছেন তিনি। তাই উমফান-বিপর্যয়ে নিজের পরিবারের সকলকে ফ্লাড সেন্টারের নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়ে, নিজে নেমে পড়েছেন জলে। জলে নেমে, দু’হাত নেড়ে মরা মাছ, মুরগি তুলে তুলে রাখছেন বড় বড় বালতিতে। একসঙ্গে করে সেগুলো নিয়ে যাওয়া হবে শুকনো বা অপেক্ষাকৃত কম জলে ডুবে থাকা কোনও জায়গায়। তার পরে পুঁতে ফেলা হবে মাটির নীচে। কারণ এই সব দেহ পচে জল নষ্ট হয়ে গেলে তা গোটা অঞ্চলের আন্ত্রিকের বিপদ বাড়াবে ভয়াবহ ভাবে। উমফান ঝড়ে একাধিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় জলবন্দি সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ গোটা এলাকা। বহু নৌকো, লঞ্চ নষ্ট হওয়ায় যোগাযোগ পরিষেবা ভীষণ ভাবে ব্যাহত। টেলিফোনের নেটওয়ার্ক না থাকায় বহু এলাকার খবরই এখনও এসে পৌঁছয়নি বাইরে। বহু জায়গায় ত্রাণ পৌঁছয়নি, যোগাযোগের পথ খুঁজে না পেয়েই। এমনকি সরকারি কর্তারাও ক্ষয়ক্ষতি মাপতে পৌঁছতে পারেননি অনেক জায়গায়। তাতে কী! ঠিক সময়মতো পৌঁছে গেছেন এই নিচুতলার কর্মীরা। নৌকোয়, ভ্যানে, সাঁতার কেটে চলে গেছেম দুর্গমতম গ্রামগুলিতে। প্রাণপণে সাফ করছেন জল, বাঁধছেন মাথা গোঁজার অস্থায়ী ঠাঁই। ঘিরছেন ত্রিপল দিয়ে। গ্রাম পঞ্চায়েতের এই নিচুতলার কর্মীরা সারা বছরই নানা রকম কাজে সুন্দরবন সচল রাখলেও, তাঁদের কথা আলাদা করে ভাবেন না কেউ। কিন্তু যে কোনও ঝড়-তুফান-বন্যায় তাঁরা ঈশ্বরসম।
রাজ্যের সদর শহর কলকাতা থেকে কয়েক ঘণ্টার পথ হলেও, বিপর্যয়ে তা পার করা বেশ কঠিন। তার উপর তা যদি হয় সুপার সাইক্লোন উমফানের মতো তীব্র কোনও সর্বগ্রাসী ঝড়, তবে তার অভিঘাতে তছনছ হওয়া শহরকে সামলে, সুন্দরবন অবধি পৌঁছনো আরওই কঠিন। এ কথা বোঝেন সুন্দরবনের বাসিন্দারাও। গোসাবার সঞ্জিত মণ্ডল যেমন বলছিলেন, “কলকাতাও তো শুনেছি পুরো অন্ধকার। কারেন্ট নেই, জল নেই, টেলিফোন নেই। ওঁরাই বা কত তাড়াতাড়ি আসবেন এতদূর!” কিন্তু সঞ্জিতবাবুর মতো আরও সকলেই জানেন, প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার জন্য পঞ্চায়েত কর্মীরা আছেন তো সেখানে! এমনিতেই বাঁধ ভেঙে জলমগ্ন এলাকাগুলোয় পানীয় জলের সমস্যা প্রবল। মানুষজনকে বহু দূরে দূরে যেতে হচ্ছে জল আনতে। যে ক’টা পুকুরে নোনা জল ঢোকেনি, সেসব জায়গা থেকে জল এনে, কোনও ভাবে ফুটিয়ে খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। যে ক’টা টিউবওয়েল জেগে আছে, সেগুলোও যে খুব নিরাপদ তা নয়। তাই ভাল পুকুরগুলোয় যাতে জল না ঢোকে, তার ব্যবস্থা করতেও প্রাণপণে বাঁধ গড়ছেন কর্মীরা। কারণ এই পুকুরগুলি নষ্ট হয়ে গেলে মানুষ বাধ্য হয়েই জমে থাকা নোনা জল তুলে থিতিয়ে, ফুটিয়ে খাবেন। আর তা রীতিমতো বিষক্রিয়ার সম্ভাবনা বাড়াবে। তাই জল পচে যাওয়ার হাত থেকে যতটা সম্ভব বাঁচানোই আপাতত লক্ষ্য তাঁদের। এছাড়াও কোনও ভাবে খবর পেলেই কিছু পরিবারের কাছে ত্রিপল, বাঁশ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা। নিজেরাই বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ভ্যানে, নৌকায়। পৌঁছতে গিয়ে যেখানে রাস্তা মিলছে না, বাঁধ একেবারেই ভেঙে গেছে, সেখানে নিজেরাই মাটির বস্তা এনে দড়ি দিয়ে বেঁধে অস্থায়ী পথ নির্মাণ করছেন। তাঁরা পঞ্চায়েতের নিচুতলার কর্মী, তাঁরাই এই বিপদের দিনে অন্ধের যষ্টি।
কিন্তু যতই পরিশ্রম করুন তাঁরা দল বেঁধে, এভাবে যে এবারের বিপর্যয় সামাল দেওয়া যাবে না, সে হতাশাও ঝরে পড়ছে সকলের গলায়। প্রৌঢ় এক কর্মী রাণু মান্না এই একই কাজ করেছেন আয়লার সময়েও। জানালেন, সেবার তাঁরা কেউ জানতেন না কী হতে পারে, কতটা হতে পারে। কয়েক মিনিটের ঝড়ের পরে আচমকা দেখেছিলেন ধ্বংসস্তূপের প্লাবন। “এবার আমরা সাত-আট দিন আগে থেকে রেডি ছিলাম। টিম তৈরি করে রেখেছিলাম। কিন্তু কী হল! সেই দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত একটানা ঝড় চলল, বাঁধ ভাঙল। জল আর জল। এত জল কবে সাফ হবে, কীভাবে হবে জানি না। আয়লার সময়েও এমনটা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এতটা বেশি এলাকায় জল ঢোকেনি সেবার। এবার যেন কূল খুঁজে পাচ্ছি না আমরা!” ত্রাণের গাড়ি আসে সুন্দরবনে। চাল-মুড়ি-ত্রিপলের জন্য দূর দূর থেকে জল পেরিয়ে এসে ভিড় করেন মানুষ। সংগ্রহ করে নিয়ে যান কয়েক দিনের রসদ। ত্রাণ শিবিরের খিচুড়ির স্বাদ ক্রমে কমে আসে। ধীরে ধীরে, একটা একটা করে বাঁশ সাজিয়ে ফের গড়া হয় ঘর। আরও ধীরে ধীরে, নতুন কোনও বিপদের শঙ্কা বুকে নিয়েই ভাঙা কোমর সোজা করার চেষ্টা করে সুন্দরবন। আর তার আড়ালে থেকে যান এই মানুষগুলি। যাঁরা নিজের ঘর আগে সামাল দেওয়ার কথা না ভেবেই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সুন্দরবনকে মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টায়। শত কুর্নিশ কম পড়ে তাঁদের জন্য।
