খবরটি শুনুন
অডিও সংস্করণ
ল্যাবরেটরিতে পশুদের উপর কোভিড ভ্যাকসিনের ক্লিনিকাল ট্রায়ালে সাফল্য। প্রথম পর্যায়ে মানুষের শরীরে ট্রায়ালের ফলও সন্তোষজনক। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে হয়তো হাজার তিনেক মানুষের উপর কোভিড ভ্যাকসিনের ট্রায়াল শুরু হবে, তারপরেই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে সঠিক তথ্য দেওয়া যাবে, এমনটাই জানিয়েছেন দেশের অন্যতম বড় ড্রাগ ও ভ্যাকসিন নির্মাতা সংস্থা সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া। কোভিড ভ্যাকসিন তৈরির কাজে অনেকটাই এগিয়েছে সেরাম। বর্তমানে বিশ্বের তিন বড় কোম্পানির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিন রকমের কোভিড ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চলছে সেরামে। তাছাড়াও রয়েছে সংস্থার নিজস্ব ফর্মুলা। “কোভিড ভ্যাকসিন তৈরিতে এখনই সফল হয়েছি সেটা বলা যাবে না। বিশ্বের নানা কোম্পানি ও সায়েন্স রিসার্চ ফার্ম আমাদের সঙ্গে কাজ করছে। প্রি-ক্লিনিকাল স্টেজে পশুদের শরীরে ভ্যাকসিনের ট্রায়াল হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে অল্প সংখ্যক মানুষের শরীরে ভ্যাকসিন দিয়ে ফলাফল লক্ষ্য করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল শুরু হতে চলেছে। তার পরেই সঠিক তথ্য সামনে আনা হবে,” বলেছেন সেরাম ইনস্টিটিউটের সিইও আদর পুনাওয়ালা। অস্ট্রিয়ার থেমিস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোডাজেনিক্স ও ব্রিটেনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিন রকমের কোভিড ভ্যাকসিন তৈরি হচ্ছে সেরাম ইনস্টিটিউটে। তাছাড়া যক্ষ্মা (Tuberculosis) প্রতিরোধক ‘ব্যাসিলাস ক্যালমেট গেরান’ (বিসিজি)ভ্যাকসিনের ক্লিনিকাল ট্রায়ালও চলছে সেরামে। সিইও আদর পুনাওয়ালা জানিয়েছেন, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর অনুমোদনে বিসিজি ভ্যাকসিনের নয়া ভার্সন নিয়ে গবেষণা চলছে সেরামে। কোভিড ভ্যাকসিনের গবেষণা ট্রায়ালের কাজে সেরাম কতটা অগ্রসর হল জানতে সংস্থার রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান উমেশ শালিগ্রামকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজ্ঞানবিষয়ক বিভাগের মুখ্য উপদেষ্টা কে বিজয় রাঘবন। তার উত্তরে শালিগ্রাম বলেছেন, ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের ফলাফল দেখে বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনতে আরও ৪-৬ মাস সময় লাগবে। তবে গোটা বিশ্বে কোভিড ভ্যাকসিন পৌঁছে দিতে ভারতই অগ্রণী ভূমিকা নেবে। কোভিড ভ্যাকসিনের ৬০-৭০% বিশ্বের নানা দেশে বিক্রি করবে সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া। সিইও আদর বলেছেন, দেশেই বছরে সাড়ে তিন থেকে চার কোটি ডোজে তৈরি হবে কোভিড ভ্যাকসিন। এক একটি ডোজের দাম পড়বে হাজার টাকার কাছাকাছি। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে দেশবাসীকে বিনামূল্যেই ভ্যাকসিনের ডোজ দেওয়া হবে।
কোভিড ভ্যাকসিন নিয়ে কী কী কাজ চলছে সেরাম ইনস্টিটিউটে?
অস্ট্রিয়ার কোম্পানি থেমিসের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কোভিড ভ্যাকসিন বানাচ্ছে সেরামকরোনার স্পাইক প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় করে তার থেকে ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চালাচ্ছে অস্ট্রিয়ার অন্যতম বড় ফার্মাসিউটিক্যালস থেমিস গ্রুপ। এই কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই ভ্যাকসিন তৈরি হচ্ছে ভারতেই। থেমিসের ফর্মুলার সঙ্গে সেরামের গবেষণা ও ট্রায়াল মিলে গিয়ে কাজ এগোচ্ছে খুব দ্রুত। সিইও আদর জানিয়েছেন, প্যাথোজেনের প্রোটিন বা অ্যান্টিজেন শরীরে ঢুকিয়ে অ্যান্টিবডি তৈরি করাই এই ভ্যাকসিনের মূল কাজ। সেক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের স্পাইক গ্লাইকোপ্রোটিনকে কাজে লাগানো হয়েছে। এই প্রোটিনই মানুষের শরীরের কোষে ঢুকতে পারে। তাই স্পাইক প্রোটিনকে বিশেষ উপায় নিষ্ক্রিয় করে তার থেকেই এমন ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট তৈরি হচ্ছে যা শরীরে ঢুকলে সংখ্যায় বেশি বাড়বে না অর্থাৎ ভাইরাসের প্রতিলিপি তৈরির ক্ষমতা একটি গন্ডির মধ্যেই থাকবে অথচ প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি হবে। এই অ্যান্টিবডি যে কোনও রকমের সংক্রামক প্যাথোজেনের প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় করতে পারবে।
করোনার জেনেটিক মিউটেশন বা জিনের বদল ঘটানোর প্রক্রিয়াকে বন্ধ করতে পারবে এই ভ্যাকসিন। এর ফর্মুলা তৈরি হয়েছে ভারতীয় আয়ুর্বেদের উপর ভিত্তি করে। কোডাজেনিক্স ও সেরামের মিলিত উদ্যোগে তৈরি এই ভ্যাকসিনের প্রাথমিক পর্যায়ের ট্রায়াল হয়েছে পুণের নাইডু হাসপাতালে। তিন ভাবে এই ভ্যাকসিনের ট্রায়াল হয়েছে। সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে এমন ব্যক্তির উপরে, কোভিড পজিটিভ রোগীর উপরে এবং কোভিড পজিটিভ অথচ সংক্রমণের উপসর্গ নেই অর্থাৎ লক্ষণহীন বাহক বা অ্যাসিম্পটোমেটিক রোগীর উপরে। এই ট্রায়ালের ফল সন্তোষজনক হলে পরবর্তী পর্যায়ের ট্রায়াল শুরু হবে বলে জানিয়েছে সেরাম।
অক্সফোর্ডের ভাইরোলজিস্ট সারা গিলবার্টের টিমের তৈরি ভেক্টর ভ্যাকসিনের ক্নিনিকাল ট্রায়াল রেসাস প্রজাতির বাঁদরের উপর ব্যর্থ হয়েছে। এই বাঁদরের শরীরে কোভিড সংক্রমণ রুখতে না পারলেও নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করেছে এই ভ্যাকসিন। মানুষের শরীরে কীভাবে এই ভেক্টর ভ্যাকসিনের প্রয়োগ সফল হবে সেই নিয়ে বৃহত্তর গবেষণা চলছে অক্সফোর্ডে। গবেষণার নেতৃত্বে রয়েছেন ভাইরোলজিস্ট সারা গিলবার্ট, অধ্যাপক অ্যান্ড্রু পোলার্ড, টেরেসা লাম্বে, ডক্টর স্যান্ডি ডগলাস ও অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান হিল। জেন্নার ইনস্টিটিউট ভাইরোলজি বিভাগের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নতুনভাবে ভ্যাকসিনের ডিজাইন করা হচ্ছে। ডক্টর অ্যাড্রিয়ান হিলের তত্ত্বাবধানে ভারতে এই গবেষণা চালাচ্ছে একমাত্র সেরাম ইনস্টিটিউট। গবেষকউমেশ শালিগ্রাম বলেছেন, এই ভ্যাকসিন ডিজাইন করা হয়েছে অ্যাডেনোভাইরাস থেকে। এই অ্যাডেনোভাইরাস শিম্পাঞ্জির শরীরে মামুলি সর্দি, জ্বরের জন্য দায়ী। এই ভাইরাসকেই ‘পিউরিফায়েড’ বা বিশুদ্ধ করে তাকে নিষ্ক্রিয় করে ভেক্টর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। শুরুতে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন ক্যানডিডেটের নাম ছিল ChAdOx1 nCoV-19। বর্তমানে এর নয়া ভার্সনের নাম হয়েছে AZD1222। কীভাবে তৈরি হচ্ছে এই ভ্যাকসিন? শিম্পাঞ্জির শরীর থেকে নেওয়া অ্যাডেনোভাইরাসকে ল্যাবে এমনভাবে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে যাতে মানুষের শরীরে কোনও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে না পারে। এরপর, সার্স-কভ-২ ভাইরাসের কাঁটার মতো অংশ অর্থাৎ স্পাইক গ্লাইকোপ্রোটিনগুলোকে আলাদা করা হয়েছে। এই ভাইরাল প্রোটিন আগে থেকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা অ্যাডেনোভাইরাসের মধ্যে ঢুকিয়ে ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট ডিজাইন করা হয়েছে। এখন ভ্যাকসিন ইনজেক্ট করলে এই বাহক ভাইরাস অর্থাৎ অ্যাডেনোভাইরাস করোনার স্পাইক প্রোটিনগুলোকে সঙ্গে করে নিয়েই মানুষের শরীরে ঢুকবে। দেহকোষ তখন এই ভাইরাল প্রোটিনের উপস্থিতি বুঝতে পেরে তার প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি করবে। সেই সঙ্গে দেহকোষের টি-সেল (T-Cell) গুলোকে উদ্দীপিত করবে। এই টি-সেল হল শরীরে অন্যতম বড় অস্ত্র। এর কাজ হল বাইরে থেকে আসা যে কোনও সংক্রামক জীবাণুকে খতম করে দেওয়া। একদিকে অ্যান্টিবডি অন্যদিকে টি-সেল, এই দুই অস্ত্রেই ধ্বংস হয়ে যাবে ভাইরাসে সংক্রামক প্রোটিন।সূত্রঃ thewall

