খবরটি শুনুন
অডিও সংস্করণ
২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই মাতৃভাষা দিবসের রাজবংশী কামতাপুরী সম্প্রদায়ের মানুষ ধূপগুড়ির আলতাগ্রাম রেল স্টেশনের রেল রুখো আন্দোলনের নিহতদের শহীদ হিসেবে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বর্তমান রাজ্য সরকার রাজবংশী কামতাপুরী ভাষায় স্বীকৃতি দিলেও তৎকালীন রাজবংশী কামতাপুরী ভাষার কোনো সরকারি স্বকৃতি ছিল না বলে জানা গেছে। আর রাজবংশী-কামতাপুরী ভাষা সহ পৃথক রাজ্যের দাবিতে তৎকালীন গড়ে উঠেছিল উত্তরখন্ড দল। যাদের মূল লক্ষ্য ছিল, ভাষার দাবী এবং আলদা রাজ্যের দাবি।
আর এই দাবিতে ১৯৮৭ সালের ২৫ শে জানুয়ারি ধূপগুড়ির আলতাগ্রাম রেল স্টেশনে রেল রুখো আন্দোলন হয়েছিল এবং পুলিশের গুলিতে সেদিন দুই জন আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়েছিল। আর এই আন্দোলনকে ঐতিহাসিক আন্দোলন বলতে চাইছে ইতিহাসবিদরা। উত্তরখন্ড আন্দোলন নিয়ে গবেষক ডাঃ নির্মল চন্দ্র রায় বলেন, পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে স্বাধীনতার উত্তরকালে এই প্রথম একটি জনগোষ্ঠী তাদের দাবী নিয়ে রেল রুখো আন্দোলন করেছে। যা একটি ঐতিহাসিক ঘটনাতো বটেই এবং উত্তরবঙ্গের বুকে প্রথম আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। এটি একটি জনগোষ্ঠীর আন্দোলনেই শুধু নয়, এই ঘটনার যথেষ্ট ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। এবং তিনি আরোও বলেন, তার রেশ আজও বিদ্যমান।
আরো পড়ুন: Earthquake: ফের ভূমিকম্পে কেপে উঠলো উত্তরবঙ্গ!
ময়নাগুড়ির জল্পেশ মন্দির সংলগ্ন এলাকায় উত্তরখন্ড দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সিদ্ধান্ত হয় যে ভাষা এবং রাজ্যের দাবিতে রেল রুখো আন্দোলন করা হবে। রেল রুখো আন্দোলন প্রথমদিকে সায় না দিলেও পরবর্তীতে দলের অধিকাংশের মতের ভিত্তিতে সায় দেয় উত্তরখন্ড দলের প্রতিষ্ঠাতা পঞ্চানন মল্লিক। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া হয় উত্তরখন্ড দলের সাধারণ সম্পাদক সম্পদ রায়কে। দিন ঠিক হয় প্রজাতন্ত্র দিবসের আগের দিন তথা ২৫ শে জানুয়ারি, আলতাগ্রাম রেল স্টেশনে সকাল ৬ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত ১২ ঘন্টা রেল অবরোধ করবে। সেই মতো বিভিন্ন জায়গা থেকে দলে দলে লোকজন এসে জমায়েত হতে থাকে। ধূপগুড়ির কালীরহাট ঠাকুর পঞ্চানন স্কুলেও লোক জন জড়ো হয়।
সকাল হতেই কালীরহাট ঠাকুর পঞ্চানন স্কুল থেকে একটি মিছিল বের হয়। আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন সম্পদ রায়, রুক্ষিনি রঞ্জন রায়, তুষার বর্মন, নারায়ন রায় সহ অন্যান্যরা। মিছিল বের হয়ে ধূপগুড়ির কালীরহাট সংলগ্ন আলতাগ্রাম রেল স্টেশনে রেল অবরোধ করে। পরবর্তীতে বিভিন্ন জায়গায় থেকে মিছিল এসে আন্দোলনকারীরা আলতাগ্রাম রেল স্টেশনে জড়ো হয়। সময় যখন বাড়তে থাকে আরও বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আসতে থাকে। অনেকে আবার রেল অবরোধ দেখার জন্য ছুটে আসে। পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী সেদিন ৫ হাজারের উপর লোক হয়েছিল এবং দলীয় হিসেবে এই সংখ্যাটা দ্বীগুন। অন্যদিকে রেল অবরোধ তোলার জন্য দফায় দফায় পুলিশ আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনা করে।
কিন্তু আন্দোলনকারীরা অবরোধ তুলতে নারাজ। ৫ টা নাগাদ আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের ধস্তাধস্তি হয় এবং আন্দোলনকারীরা পুলিশের উপর পাথর নিক্ষেপ করে বলে জানা গেছে। অবস্থা বেগতিক দেখে পুলিশ গুলি চালায় এবং পুলিশের গুলিতে দুই জন আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়। এঁরা হলেন, শিলিগুড়ি সাহুডাঙ্গি এলাকায় উত্তরখন্ড দলের নেতা জগদীশ রায় এবং ময়নাগুড়ির জল্পেশ এলাকার গজেন রায়। ধূপগুড়ির একটি পাক্ষিক পত্রিকা লাল নক্ষন অনুযায়ী সেদিন পুলিশ ১৫ রাউন্ড গুলি চালিয়েছিল। পরবর্তীতে পুলিশ ১৭ জন আন্দোলনকারীর নামে বিভিন্ন ধারায় কেস দায়ের করে।
ইতিহাসবিদ রতন চন্দ্র রায়, "ভাষা দিবসে রাজবংশী কামতাপুরী মানুষের মাতৃভাষার দাবিতে রেল রুখো আন্দোলনের এই দুই জন প্রথম শহীদ হয়েছিল। তাই নিঃসন্দেহে রাজবংশী সম্প্রদায়ের কাছে এই আন্দোলন স্মরনীয় এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসেও এঁরা স্মরনীয়.