খবরটি শুনুন
অডিও সংস্করণ
পুজোর আর এক মাসও বাকি নেই। মৃৎশিল্পীদের মধ্যে এখন চরম ব্যস্ততা। কোভিড-পর্ব কাটিয়ে দু-বছর পর ভালো অর্ডার আসতে শুরু করেছে। কিন্তু এই খুশির সময়েও চিন্তিত শিলিগুড়ির পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা। এইবছর শিলিগুড়িতে পর্যাপ্ত মাটি পাওয়া যাচ্ছে না, যাওবা পাওয়া যাচ্ছে তাও আবার দাম বেশি। এদিকে মাটি আনার ভ্যান খরচও অতিরিক্ত বেড়ে গিয়েছে। ফলে খুশির মাঝেও চিন্তার ছাপ ফেলে রেখেছে শিলিগুড়ির মৃৎশিল্পীদের জীবনে।
বাংলার সংস্কৃতি তার শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে রেখেছে গোটা বিশ্বে।
বাংলার লোকাচার, জীবনযাপন, সামাজিক অবস্থান, রীতিনীতি এবং ঐতিহ্যের অনেককিছুই লুকিয়ে আছে শিল্পের সৃজনশীলতায়। বাংলার শিল্প কেবল একটি জাতির জনজীবনের কর্মসংস্থানের মাধ্যম নয়, তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া অঞ্চলভিত্তিক যাপনের বহু দৃষ্টান্তকে। তাই প্রযুক্তির অগ্রগতিতে ধীরে ধীরে মাটির তৈরী জিনিস ধামাচাপা পড়লেও, সংস্কৃতি এবং উৎসবের আমেজে মাটির জিনিসের চাহিদার হিড়িককে ছাপিয়ে যেতে পারেনি কোনো প্রযুক্তিই।
তাই তো সারাবছর ব্যবসায় লাভের মুখ না দেখলেও, পূজোর সময় বুক বেঁধে অপেক্ষা করেন মৃৎশিল্পীরা। মাটির সামগ্রী বানিয়ে সংসার চলে তাঁদের। কেউ ৫০ বছর আবার কেউবা ৪০ বছর ধরে এই ব্যবসা করে আসছেন। মাটির তৈরি জিনিসপত্র বা মৃৎশিল্প আমাদের আবহমান গ্রাম বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য। এক সময় বাংলায় মাটির তৈরি জিনিসপত্রের ব্যাপক ব্যবহার ও চাহিদা ছিল। আধুনিকতার ছোঁয়ায় কালের বিবর্তনে মাটির তৈরি অনেক নিপুণ হাতের তৈরি তৈজসপত্র হারিয়ে যেতে বসেছে।
এক সময় মাটির জিনিসপত্র তৈরিতে কুমার পাড়ার মৃৎশিল্পীরা সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতো। নিত্যপ্রয়োজনীয় হাঁড়ি-পাতিল, ডাবর-মটকি থেকে শুরু করে মাটির ব্যাংক, শো-পিস, গহনা, কলস, ফুলের টব, ফুলদানি, ঢাকনা, পিঠে তৈরির সাজ এবং নানা রকম খেলনা তৈরি করতেন মৃৎশিল্পীরা। কিন্তু আধুনিক যুগে কাঁচ, সিলভার, এ্যালুমিনিয়াম, প্লাস্টিক অথবা মেলামাইনের ভীড়ে মাটির তৈরি জিনিসপত্র বিলীন হতে চলেছে।
আধুনিক যন্ত্রপাতিতে তৈরি নানা রঙ ও বর্ণের দৈনন্দিন ব্যবহৃত জিনিসপত্রের ভীড়ে সবুজ-শ্যামল ফসলের মেঠো পথের গ্রামীণ বাংলা থেকে মৃৎশিল্প আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
তবে এরই মাঝে আশার আলো দেখছেন শিল্পীরা। সামনেই বাঙ্গালীর শ্রেষ্ঠ উৎসব দূর্গাপুজো। দূর্গাপুজো মানেই মাটির সামগ্রীর প্রয়োজন। তাই চরম উদ্যমে কাজ শুরু করেছেন মৃৎশিল্পীরা। যদিও চিন্তার ছাপ ফেলছে মাটির দামে। মৃতশিল্পীদের একাংশের অভিযোগ, মাটির দাম বাড়ছে, কিন্তু মাটির জিনিস তৈরীর পর সেগুলির দাম বাড়েনি। একটু বেশি দাম বললেই ক্রেতারা ফিরে যাচ্ছেন।
শিলিগুড়ির বিভিন্ন পালপাড়া বলুন কিংবা কুমোরপাড়া, পূজোর আগ থেকেই মাটির তৈরী ধূপতি, প্রদীপ, ঘট, কলসি তৈরী করতে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা। তবে গত দুইবছর কোভিডের কারণে অনেকটাই ধস নেমেছিল। চলতি বছরে আশার আলো দেখছেন মৃৎশিল্পীরা। পূজোর দুই মাস আগে থেকেই তারা বরাত পেয়েছেন। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া হওয়ায় জিনিসের দাম তেমণ পাচ্ছেন না বলে আক্ষেপ করেছেন।
শিল্পী পুষ্পপদ পাল বলেন, "এবারে মাটির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। মাটি আনতে গেলে দ্বিগুণ দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। গতবছর এক ট্রলি মাটির দাম ছিল ১৫০০ টাকা। এখন হাফ ট্রলি মাটির দাম হচ্ছে প্রায় ৩০০০ টাকা। পাশাপাশি অন্যান্য জিনিস যেমন খড়, সুতলি, রঙ, সাজসজ্জার দামও দ্বিগুণ বেড়েছে। তবে এত দাম দিয়েও মাটি ঠিকমত পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে মাটির জিনিসের দামও বাড়ছে না।