মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথমবার উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়ে শিলিগুড়িতে বড় ঘোষণা শুভেন্দু অধিকারীর। ১ বছরের মধ্যে সংকল্পপত্রের সমস্ত প্রতিশ্রুতি পূরণের আশ্বাস।

শিলিগুড়ি: জনগণকে দেওয়া সমস্ত প্রতিশ্রুতি আগামী এক বছরের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করবে রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার পর নিজের প্রথম উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়ে এই বড় ঘোষণাটি করলেন শুভেন্দু অধিকারী। সেই সঙ্গেই তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নতুন সরকারের যাবতীয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের তালিকায় উত্তরবঙ্গই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার লাভ করবে।
পশ্চিমবঙ্গের বিগত কয়েকটি নির্বাচন লক্ষ্য করলে দেখা যায়, উত্তরবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি লাগাতার দুর্দান্ত ফলাফল করে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজ্যে পদ্ম শিবির সরকার গঠনের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর এই উত্তরবঙ্গ সফরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে তুমুল নজর তৈরি হয়েছে। বুধবার উত্তরকন্যায় মুখ্যমন্ত্রীর একটি প্রশাসনিক বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। তবে তার পূর্বে শিলিগুড়ির দলীয় কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে বিজেপির নেতা ও কর্মীদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন তিনি। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী জানান, সংকল্পপত্রে যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে। যার কিছু ইতিবাচক ফলাফল ইতিপূর্বেই মিলেছে এবং আগামী জুন মাস থেকেও আরও কিছু সুফল পাওয়া যাবে। পর্যায়ক্রমে আগামী তিন মাস, ছয় মাস এবং এক বছরের মধ্যে মানুষের কাছে দেওয়া সমস্ত কথা এই সরকার পূরণ করবে।
বিগত নির্বাচনগুলিতে উত্তরবঙ্গের মানুষের অভূতপূর্ব সমর্থনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, তাঁর সরকার এই অঞ্চলটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেবে। শুভেন্দুর ভাষায়, "উত্তরবঙ্গ হল বিজেপির ভদ্রাসন।" আর সেই কারণেই সরকারের সমস্ত প্রগতিশীল ও উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গই প্রথম অগ্রাধিকার পাবে। এই প্রসঙ্গে তিনি আরও জানান, আগামী জুলাই মাসে তিনি পুনরায় উত্তরবঙ্গ সফরে আসছেন। তার আগে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে তাঁর পরামর্শ, রাজ্য সরকারের কাছে কোনো প্রস্তাব দেওয়ার থাকলে তা যেন নথিভুক্ত করে রাখা হয়। জুলাই মাসের সফরে এসে তিনি সেই প্রস্তাবগুলি সংগ্রহ করবেন এবং সরকারি নিয়মে যেগুলি করা সম্ভব, সেগুলি দ্রুত সম্পন্ন করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
পাশাপাশি বিজেপি কর্মীদের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তাঁর জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পরামর্শ থাকলে কর্মীরা যেন তা নিজেদের জেলা সভাপতিদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফরোয়ার্ড করে দেন এবং নিচে নিজেদের মোবাইল নম্বরটি উল্লেখ করেন। জেলা সভাপতিরা সেই পরামর্শগুলি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দেবেন, এমন একটি নতুন ব্যবস্থা তিনি চালু করে গেলেন। মুখ্যমন্ত্রী জোরালো দাবি করেন, তাঁর শাসনকালে রাজ্যে কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ প্রশ্রয় পাবে না এবং পশ্চিমবঙ্গে এবার প্রকৃত অর্থেই একটি সামগ্রিক বদল আসবে। শুভেন্দুর কথায়, "আমরা শুধু ঝান্ডা, দল, পথ বা ব্যক্তির পরিবর্তন চাই না; আমরা ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই।" ইতিমধ্যে গত দুই সপ্তাহে অনেক প্রশাসনিক ব্যবস্থার বদল ঘটানো হয়েছে, যার ফলে কাটমানি, সিন্ডিকেট-রাজ এবং মাফিয়াগিরির কোনো স্থান থাকবে না বলে তিনি স্বপ্ন দেখান।
শিলিগুড়ির এই দলীয় সভা থেকে রাজ্যের পূর্বতন তৃণমূল সরকারকে তীব্র নিশানা করেন শুভেন্দু অধিকারী। বিগত সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, অতীতে মানুষকে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে এবং পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে বিভক্ত করার রাজনীতি চলেছে। তবে বিজেপির এই নতুন সরকার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে বদ্ধপরিকর।
শিলিগুড়িতে পা রাখতেই মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত কড়া ভাষায় স্পষ্ট করে দেন যে, পূর্বতন সরকারের আমলে গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা জিটিএ (GTA)-তে কীভাবে কাজকর্ম পরিচালিত হয়েছে, কতটা কাজ হয়েছে এবং কোন কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল, তার সমস্ত ফাইল এবার নতুন করে খোলা হবে। পাহাড়ের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে রেয়াত করা হবে না বলে কড়া বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এর আগে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিকও (Nisith Pramanik) একইভাবে উত্তরকন্যায় দাঁড়িয়ে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিলেন এবং সমস্ত বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনি সপ্তাহে একদিন করে উত্তরকন্যায় বসে সমস্ত কাজকর্ম তদারকি করবেন বলেও জানান। মন্ত্রীর সেই বার্তার পর এবার খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই ‘জিটিএ ফাইলস’ খোলার হুঁশিয়ারি পাহাড়ের রাজনৈতিক অলিন্দে ব্যাপক কম্পন তৈরি করেছে।
অন্য পরিপ্রক্ষিতে, বিধানসভা নির্বাচনে সাফল্যের পর গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সুপ্রিমো বিমল গুরুংয়ের মূল লক্ষ্য এখন জিটিএ। স্বজনপোষণ এবং দুর্নীতির মারাত্মক অভিযোগ তুলে অতি সম্প্রতি ‘লালকুঠি’ ঘেরাও অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন তিনি। যদিও বর্তমানে পর্যটনের ভরা মরশুম চলায় সেই আন্দোলন থেকে সাময়িকভাবে পিছিয়ে এসেছেন তিনি। বিমল গুরুংয়েরও স্পষ্ট অভিযোগ যে, তৃণমূল জমানায় জিটিএ-র অন্দরে প্রবল দুর্নীতি হয়েছে।
Advertisement