গুজরাত-অসমের মডেলে বাংলায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি! ৭ জুলাই নাকি সোমবার, কবে বিল পেশ সরকারের?

June 28, 2026
Reading...
পশ্চিমবঙ্গে ইউনিফর্ম সিভিল কোড (UCC) বিল পেশ নিয়ে বিধানসভায় চরমে রাজনৈতিক উত্তেজনা। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পদক্ষেপে বিরোধী তৃণমূল, সিপিএম...
কলকাতা: রাজ্য রাজনীতিতে এখন মূল ফোকাস বিধানসভার বাজেট অধিবেশন (West Bengal Assembly Budget Session)। সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (CM Suvendu Adhikari) নেতৃত্বাধীন সরকারের বাজেট অধিবেশনের প্রথমার্ধ শেষ হতে চলেছে। এদিনই শাসক এবং বিরোধী শিবিরের মধ্যে ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC Bill) বিলকে কেন্দ্র করে জোরদার সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার বিধানসভায় এবং পরবর্তীতে রাতের একটি দলীয় কর্মসূচিতে এই বিলের সপক্ষে জোরালো বার্তা দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এরপর থেকেই সোমবার বিধানসভায় বহু প্রতীক্ষিত এই বিলটি পেশ হওয়ার জল্পনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। যদিও সরকারি কার্যবিবরণীতে এখনও বিলটি পেশ করার কোনও উল্লেখ নেই, তবুও শাসকদলের তৎপরতা ও বিরোধীদের রণংদেহি মেজাজ প্রবল রাজনৈতিক ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধিকে আইনি বৈধতা দিতে রাজ্য সরকার বদ্ধপরিকর। অসম, উত্তরাখণ্ড এবং গুজরাতের ইউসিসি আইনের খসড়া এনে বাংলার আইন দফতর ইতিমধ্যেই তা নিয়ে জোরদার পর্যালোচনা শুরু করেছে। রাজ্যে বিলটি আইনে পরিণত হলে আদিবাসী সমাজ বাদে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের উপর এর ঠিক কেমন প্রভাব পড়বে, তার আইনি দিকগুলিও বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি, ওই তিন রাজ্যে বিল পেশের সময় বিরোধীরা যে প্রশ্নগুলি তুলেছিল এবং আইনের যে খামতিগুলি ছিল, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগেভাগেই যাবতীয় জবাব তৈরি রাখছে সরকারপক্ষ।

বিধানসভা সূত্রে খবর, মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরেই এই বিল নিয়ে বিতর্কের জন্য বিজেপি পরিষদীয় দল এক ঘণ্টা সময় বরাদ্দ করে রেখেছে। আপাতত শাসকদলের একমাত্র বক্তা হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নামই চূড়ান্ত হয়েছে, তবে পরে এই তালিকায় আরও নাম যুক্ত হতে পারে। রাজ্যে পালাবদলের পর বিধানসভার স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলি এখনও গঠিত না হওয়ায়, বিলটি নিয়ে বিশদে আলোচনার জন্য খোদ মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বেই একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হতে পারে বলেও শোনা যাচ্ছে।

অন্যদিকে, বিল আটকাতে বিধানসভার অন্দরে একজোট হচ্ছে বিরোধী শিবিরগুলি। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, তৃণমূলের দুই বিবাদমান গোষ্ঠী— বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী বা 'আসল' তৃণমূল এবং কালীঘাট তৃণমূল— উভয়েই এই বিলের সরাসরি বিরোধিতায় এককাট্টা হচ্ছে। সোমবার প্রস্তাবিত 'গুন্ডাদমন বিল'-সহ সরকারের আনা সমস্ত বিলেরই কড়া বিরোধিতা করা হবে বলে স্পষ্ট করে দিয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। জানা গিয়েছে, বাংলার সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় তাঁরা বিরোধিতার রূপরেখাও প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছেন বলে খবর।

পিছিয়ে নেই কালীঘাট শিবিরও। খবর অনুযায়ী, তাদের তরফে বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এবং বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ বিলের বিপক্ষে জোরদার সওয়াল করতে পারেন। এই জোড়া তৃণমূল শিবিরের পাশাপাশি নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীর, ডোমকলের সিপিএম বিধায়ক মোস্তাফিজুর রহমান রানা, আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী এবং কংগ্রেসের দুই বিধায়কও বিরোধিতায় সরব হবেন বলে ঠিক করেছেন। এ প্রসঙ্গে ঋতব্রত শিবিরের এক বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়ক বলেন, "অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল পেশ করা হলে আমরা তার বিরোধিতা করব। কিন্তু, বিধানসভার অন্দরে যে প্রক্রিয়ায় বিল পেশ করা হয়, তাতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিলের কোনও উল্লেখ নেই। তাই বিধানসভায় বিলটি আনা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনও আমরা অন্ধকারে আছি।"

এত প্রস্তুতির পরেও সোমবার বিল পেশ হওয়া নিয়ে যথেষ্ট পদ্ধতিগত ধোঁয়াশা বর্তমান। বিধানসভার নিয়ম অনুযায়ী, বিল পেশের আগে বিজ্ঞপ্তি জারি করে বিধায়কদের কাছে প্রতিলিপি পৌঁছে দিতে হয়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কার্য উপদেষ্টা কমিটির জরুরি বৈঠকে সোমবারের জন্য যে সূচি নির্ধারিত হয়েছে, তাতে দু’টি গুন্ডাদমন ও তোলাবাজি রোধ সংক্রান্ত বিল, অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন সংশোধনী বিল এবং ওবিসি সংরক্ষণ সংশোধনী বিলের উল্লেখ থাকলেও ইউসিসি-র নাম নেই।

বিধানসভা সচিবালয়ের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, আইন দফতর থেকে নির্দিষ্ট নথিপত্র না আসা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে, বিজেপি পরিষদীয় দলের একাংশের দাবি, সোমবার সকালে বিজ্ঞপ্তি জারি করে দুপুরে মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে কার্যবিবরণী কমিটির বৈঠক বসিয়ে অধিবেশনের দ্বিতীয়ার্ধে রাজ্য সরকার বিলটি পেশ করতেই পারে। সেক্ষেত্রে ওই দিনই বিধায়কদের টেবিলে বিলের কপি দেওয়া হতে পারে।

আবার রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছেন, সরকার চাইলে তড়িঘড়ি না করে আগামী ৭ জুলাই থেকে শুরু হতে চলা অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্বেও এই গুরুত্বপূর্ণ বিলটি আনতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা কিছুটা বাড়তি সময় পেয়ে যাবে। তবে, প্রশাসনিক মহলের শীর্ষ আধিকারিকদের অনুমান, মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে বিলটির পক্ষে সওয়াল করেছেন, তাতে সোমবারই বিধানসভায় বিল পেশ করে চমক দিতে পারে সরকারপক্ষ।
Advertisement