পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে অধরা রাজগঞ্জের প্রাক্তন বিডিও, নিউটাউনের ফ্ল্যাটে চার ঘণ্টার তল্লাশি কি শুধুই লোকদেখানো?

July 10, 2026
Reading...
স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যা খুনের তদন্তে শিলিগুড়িতে প্রকাশ্যে ঘুরছেন মূল অভিযুক্ত প্রশান্ত বর্মন।
সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) এবং কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) কড়া নির্দেশের পর স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যা খুনের তদন্তে (Swapan Kamilya Murder Case) তৎপরতা দেখাল এসটিএফ এবং সিট। জানা গিয়েছে, বুধবার রাতে রাজগঞ্জের প্রাক্তন বিডিও তথা ডব্লিউবিসিএস আধিকারিক প্রশান্ত বর্মনের (Prashanta Barman) নিউটাউনের অভিজাত আবাসনে দীর্ঘ চার ঘণ্টা ধরে চিরুনিতল্লাশি চালায় তদন্তকারী দল। এদিন ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা রাসায়নিক দ্রব্য ও উন্নত প্রযুক্তির আলোর সাহায্যে নানা প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। তবে হঠাৎ করে পুলিশের এই অতিসক্রিয়তা শুধুই লোকদেখানো কি না, তা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। কারণ, খাতায়-কলমে যিনি 'পলাতক', সেই অভিযুক্ত প্রশান্তকে মাত্র চারদিন আগেই শিলিগুড়ির রাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে ঘুরতে দেখা গিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিলিগুড়ি থানার খুব কাছেই এসএফ রোডের একটি গলি থেকে সন্ধ্যায় দুই সঙ্গীকে নিয়ে বের হন ওই আধিকারিক। এরপর দ্রুত একটি গাড়িতে চেপে তিনি জলপাই মোড়ের দিকে রওনা দেন। এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী তাঁকে দেখে চিনতেও পারেন। থানার এত সন্নিকটে একজন খুনের আসামির অবাধ যাতায়াত নিয়ে ব্যবসায়ীরা রীতিমতো বিস্মিত। তাঁদের দাবি, সরকারি ক্যামেরা ও এসএফ রোডের বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলেই তাঁর উপস্থিতির অকাট্য প্রমাণ মিলবে। বর্তমান ২০২৬ সালে একদিকে যখন ফিফা বিশ্বকাপ (Fifa World Cup 2026) নিয়ে উন্মাদনা চলছে, ঠিক সেই সময়েই অভিযুক্তের এমন প্রকাশ্য ঘুরে বেড়ানো পুলিশি সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সাধারণের ধারণা, সরকারের ওপর প্রবল চাপ তৈরি হওয়ার কারণেই মুখ বাঁচাতে নিউটাউনে এই লোকদেখানো তল্লাশি চালিয়েছেন গোয়েন্দারা।

এদিকে, কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবীরা সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার গাফিলতি নিয়ে তিনটি বড় প্রশ্ন তুলেছেন। প্রথমত, খুনের মতো ভয়ংকর অপরাধে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তের নামে এখনও কোনো 'লুক আউট নোটিশ' জারি করা হয়নি। এর ফলে বিনা বাধায় বিমানে করে ভিনরাজ্য বা বিদেশে পালানোর পুরোপুরি সুযোগ পাচ্ছেন তিনি। দ্বিতীয়ত, প্রশান্তর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকলেও তাঁর বিপুল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়নি, যা করলে অভিযুক্ত প্রবল চাপে পড়তেন। তৃতীয়ত, একজন ডব্লিউবিসিএস আধিকারিক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনের তরফ থেকে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা বা কড়া বিভাগীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। কেন আইন মেনে এই প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো করা হল না, তার কোনো সদুত্তর পুলিশ বা প্রশাসনের তরফ থেকে পাওয়া যায়নি।

জানা যায়, নিউটাউনের (New Town) যে ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালানো হয়, সেখানেই ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যাকে আটকে রাখা হয়েছিল। অভিযোগ, নীলবাতি লাগানো গাড়ির অপব্যবহার করে তাঁকে অপহরণ করা হয় এবং বাঁশ ও বেল্ট দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে পরিচিত একজনের গাড়িতে করে একটি নির্জন খালের ধারে ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ ফেলে আসা হয়। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হল, গত মে মাসে নিউটাউনেই মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে ইকো পার্ক পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন প্রশান্ত। কিন্তু খুনের মামলায় পুলিশ তাঁকে 'শোন অ্যারেস্ট' না করার ফলে সহজেই জামিন পেয়ে গা ঢাকা দেন তিনি।

এই পরিস্থিতিতে নিহত ব্যবসায়ীর পরিবার চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। মামলার পূর্বতন তদন্তকারী অফিসারকে সরিয়ে দেওয়ার পর বর্তমানে কার হাতে তদন্তের ভার রয়েছে, তা নিয়ে গভীর ধোঁয়াশায় রয়েছেন নিহতের পরিজনরা। স্বপনবাবুর শ্যালক দেবাশিস কামিল্যা জানান, অভিযুক্তের শাস্তির দাবিতে তাঁরা রাজ্য পুলিশ, মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে ই-মেল পাঠালেও কোনো উত্তর পাননি। উলটে দত্তাবাদে স্বপনের ভাড়া নেওয়া সোনার দোকানটি দ্রুত খালি করার জন্য মালিকপক্ষ ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি থাকায় প্রাণভয়ে জিনিসপত্র সরাতে রাজ্যে আসার সাহস পাচ্ছেন না তাঁরা।

তবে পুলিশ সূত্রে খবর, বিধাননগর পুলিশের ডিসি ডিডি-র নেতৃত্বে প্রশান্ত বর্মনকে ধরার জন্য একটি ৬ সদস্যের বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। এই দলে আইসি সাইবার এবং এসপি ডিডি-র মতো পোড়খাওয়া আধিকারিকরা রয়েছেন।

নিউটাউনের ফ্ল্যাটে ফরেন্সিকের বৈজ্ঞানিক নমুনা সংগ্রহের দাবি সত্ত্বেও মূল প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—শিলিগুড়ির রাস্তায় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানো প্রশান্ত বর্মনকে কি সত্যিই গ্রেপ্তার করতে পারবে পুলিশ, নাকি প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় অন্ধকার জগতের এই ডন অধরাই থেকে যাবেন? সূত্র বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম!
Advertisement