আগামী ২-৩ বছরেই দিল্লি-শিলিগুড়ি হাই-স্পিড রেল! উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে বিপুল প্রকল্পের শিলান্যাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর!

August 21, 2026
Reading...
শিলিগুড়িতে এসে করিডরের নিরাপত্তায় 'ত্রিকোণীয় গ্রিড' ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
এদিন শিলিগুড়িতে উপস্থিত হয়ে ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের ত্রিস্তরীয় সুরক্ষা নিয়ে কড়া বার্তা দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দেশের মানচিত্রে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম এই করিডরের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে সবরকম পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। শুধুমাত্র সীমান্ত সুরক্ষা নয়, বরং দ্রুত রেল সংযোগ এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়নের একাধিক পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

শুক্রবার শিলিগুড়ির রানিডাঙায় অবস্থিত সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি)-এর উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ার হেডকোয়ার্টারে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রায় ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একাধিক নবনির্মিত প্রশাসনিক ও আবাসিক পরিকাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এই বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গৌরব মোহন, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর অধিকর্তা মহেশ দীক্ষিত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ডঃ রাজেন্দ্র কুমার এবং এসএসবি-র ডিজি সঞ্জয় সিংঘল সহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অন্যান্য উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা।

জানা গিয়েছে, শিলিগুড়ি করিডর ও সমগ্র দেশের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে একটি বিশেষ ‘ত্রিকোণীয় নিরাপত্তা গ্রিড’ চালু করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। কিষাণগঞ্জ, চোপড়া এবং ধুবড়ি— এই তিনটি ঘাঁটি থেকে গোটা করিডর এলাকায় নজরদারি, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক উপস্থিতি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি, ‘তিস্তা প্রহার’-এর মতো নিয়মিত সামরিক মহড়ার মাধ্যমে এই অঞ্চলকে আরও সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা চলছে। এদিন এসএসবি জওয়ানদের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে জম্মু-কাশ্মীর, মণিপুর ও ত্রিপুরার মতো দেশের নানা প্রান্তে অসামান্য অবদান রেখেছে এই বাহিনী। কারগিল যুদ্ধের পরবর্তীতে ‘ওয়ান বর্ডার, ওয়ান ফোর্স’ নীতি কার্যকর হয়। সেই অনুযায়ী ২০০১ সাল থেকে ১,৭৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-নেপাল সীমান্ত এবং ২০০৪ সাল থেকে ৭০০ কিলোমিটার (প্রকৃতপক্ষে ৬৯৯ কিমি) উন্মুক্ত ভারত-ভূটান সীমান্তে দিনরাত এক করে প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে কঠোর পাহারার দায়িত্ব পালন করে আসছেন এসএসবি জওয়ানরা।

সীমান্ত পরিকাঠামো এবং জমির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে পূর্বতন সরকারের সমালোচনা ও বর্তমান সরকারের প্রশংসা শোনা যায় অমিত শাহের মুখে। তিনি জানান, করিডরের সুরক্ষার স্বার্থে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির দীর্ঘকাল ধরে প্রায় ৫৬০ একর জমির প্রয়োজন ছিল। অনুপ্রবেশ আটকাতে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি হওয়া সত্ত্বেও, পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েও সেই জমি মেলেনি। তবে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব গ্রহণের পরই জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
নতুন রাজ্য সরকার গঠনের মাত্র ৪৫ দিনের মাথাতেই বিএসএফ ও এসএসবি-র যাবতীয় জমিজট কাটিয়ে ১১২৯ একর জমি হস্তান্তর করা হয়েছে। এমনকি, প্রাতঃরাশের বৈঠকেই বাকি থাকা ২৯ একর জমির অনুমোদনও দ্রুত সম্পন্ন করার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

নিরাপত্তার পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থনীতি ও পর্যটন বিকাশের ওপরেও জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। 'ভাইব্রেন্ট ভিলেজ প্রোগ্রাম ২.০'-এর অধীনে প্রায় ৬৮৩৯ কোটি টাকার প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ এবং ভুটান সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিকে সড়কপথে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ চলছে। এছাড়া, ‘অমৃত ভারত স্টেশন’ প্রকল্পের আওতায় জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ি স্টেশনকে বিশ্বমানের করে তোলা হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটে ঘোষিত দিল্লি-শিলিগুড়ি হাই-স্পিড রেল করিডোর আগামী ২-৩ বছরের মধ্যেই চালু হয়ে যাবে, যার ফলে মাত্র কয়েক ঘণ্টাতেই শিলিগুড়ি থেকে দিল্লি পৌঁছানো সম্ভব হবে।

এদিন ভারত মাতা কি জয় স্লোগানের মাধ্যমে নিজের বক্তব্য শুরু করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সঙ্গীতশিল্পী ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান এবং উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং-এর পুণ্যতিথিতে তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান তিনি। বিসমিল্লাহ খানের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, সারা জীবন ভারতীয় শুদ্ধ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছিলেন এই শিল্পী। এমনকি শারীরিক অসুস্থতা এবং শ্বাসকষ্ট থাকা সত্ত্বেও তাঁর অদম্য উদ্দীপনা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্বনেতা বা সংসদের বদলে কাশী বিশ্বনাথের চরণে সকালে সানাই বাজাতেই তিনি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেতেন।
সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতা দিবসের প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। তিনি জানান, ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছর লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রীর পতাকা উত্তোলনে তিনি উপস্থিত থেকেছেন, তবে এবারের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস এক ঐতিহাসিক মাত্রা পেয়েছে। কারণ, স্বাধীনতার ৮০ বছর এবং সৃষ্টির ১৫০ বছর পর লালকেল্লা থেকে সম্পূর্ণ 'বন্দে মাতরম' গানটি দেশ ও বিশ্ববাসী শুনেছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই অমর সৃষ্টি স্বাধীনতা সংগ্রামে গতি আনার পাশাপাশি স্বাধীন ভারতের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের রূপরেখা তৈরি করেছিল। কিন্তু দেশভাগের পর রাজনৈতিক অনাগ্রহে একে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করা হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সংসদে বিল পাস করিয়ে এই সম্পূর্ণ গানটিকে সরকারি অনুষ্ঠানের অঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে দেশের বিদ্যালয়গুলিতে প্রতিদিন এই গান গাওয়ার মাধ্যমে যুবসমাজের মধ্যে দেশভক্তি জাগ্রত হবে।

২০৪৭ সালের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্যে ‘সপ্ত ধারা’ বা সাতটি মূল স্তম্ভের কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ম্যানুফ্যাকচারিং পাওয়ার, প্রতিরক্ষা শক্তি, কৃষি ও ফুড প্রসেসিং, গ্রিন ও ব্লু ইকোনমি, প্রযুক্তি ও ইনোভেশন, ভারতের সফট পাওয়ার এবং পরিকাঠামোর গতিশক্তি— এই সাতটি ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার শতবর্ষে ভারত বিশ্বে শীর্ষস্থানে পৌঁছবে বলে তিনি আশাবাদী। এছাড়াও আগামী ৩ বছরের মধ্যে দেশে ১০০ গিগাওয়াট নিউক্লিয়ার পাওয়ার এবং ৮টি নতুন সেমিকন্ডাক্টর ইউনিট তৈরির লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে।
Advertisement