উৎসবের আগেই ঊর্ধ্বমুখী চিনির দাম (Sugar price rising)। উত্তরপ্রদেশে কেজি পৌঁছাল ৬৫ টাকায়। উৎপাদন হ্রাস, ইথানল ব্লেন্ডিং ও সরকারি মজুত নীতি নিয়ে!..

গোটা দেশজুড়েই চিনির বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী। নিউ হায়দরাবাদের খুচরো ব্যবসায়ী সন্তোষ গুপ্ত জানিয়েছেন, পক্ষকাল আগেও তাঁরা প্রতি কেজি চিনি ১৮-৫০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। অন্যদিকে, ফতেগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ী সঞ্জয় জয়সওয়ানি জানান, এই প্রথমবার চিনির দর প্রতি কেজিতে ৬০ টাকার গণ্ডি পার করল। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় চলতি বছরে চিনির উৎপাদন ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। পর্যাপ্ত জোগানের অভাবেই এই মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে।
‘চিনি মণ্ডি’র একটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে আখ চাষের পরিমাণ কমেনি, তবে চিনি উৎপাদন কমেছে। ব্যবসায়ীদের মতে, চিনিকলগুলি বর্তমানে ইথানল তৈরির দিকে বেশি জোর দিচ্ছে। অ্যালকোহল ও পেট্রোল উৎপাদনকারীদের ইথানলের চাহিদা মেটাতে বেশি পরিমাণ আখ সেখানে বিক্রি করায় মুনাফাও বেশি মিলছে, যার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়ছে চিনির উৎপাদনে।
চিনির দামের এই ঊর্ধ্বগতির ফলে উৎসবের সময়ে মিষ্টির দাম বাড়ারও আশঙ্কা রয়েছে। মিষ্টি তৈরির উপকরণের প্রায় ২০ শতাংশই চিনি থাকে। উদাহরণস্বরূপ, এক কেজি খোয়া ক্ষীর প্রস্তুতিতে ২০০ গ্রাম চিনি প্রয়োজন হয়। ফলে মূল কাঁচামালের দাম বাড়লে মিষ্টির দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প থাকবে না।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ও জোগান বজায় রাখতে সরকারের তরফে ইতিমধ্যে চিনি মজুতের ঊর্ধ্বসীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা মাসে সর্বোচ্চ ১০ টনের বেশি চিনি মজুত করতে পারবেন না এবং ১৫ দিনের অতিরিক্ত সময় স্টক ধরে রাখা যাবে না। পাশাপাশি, জোগান স্বাভাবিক রাখতে আমদানিকৃত চিনির ওপর থাকা ১০০ শতাংশ শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
তবে এই সমস্ত পদক্ষেপের পরেও মূল্যের বৃদ্ধি আটকানো সম্ভব হচ্ছে না। চিনিকল থেকে প্রসেসিং মিলে পৌঁছানোর পর্যায়েই প্রতি কুইন্টাল চিনির দাম ৫৪০০ থেকে ৫৫০০ টাকায় পৌঁছে যাচ্ছে, যার সঙ্গে পরবর্তীতে যুক্ত হচ্ছে ডিলারের মার্জিন, ট্যাক্স ও পরিবহণ খরচ। এক বছর পূর্বে এই দাম ছিল ৩৯০০ টাকা। খুচরো বাজারে এক বছর আগে চিনির কেজিপ্রতি দর ছিল ৪৬.৩৪ টাকা, যা গত ১৮ অগাস্ট বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছিল ৫২.৩০ টাকা। সাধারণত প্রতি বছর অগাস্ট থেকে নভেম্বরের মধ্যে পানীয়, খাদ্য, বিস্কুট ও কনফেকশনারি সংস্থাগুলি উৎসবের কথা ভেবে চিনি মজুত করায় চাহিদা শীর্ষে থাকে। মজুত নিয়ন্ত্রণের পরেও দাম না কমায় এখন আমদানি শুল্ক তোলার সিদ্ধান্তের দিকেই নজর রয়েছে।
এদিকে মূল্য হ্রাস পাওয়ার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে Investment Information and Credit Rating Agency। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষে ভারতে ৩.১১ কোটি টন চিনি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে ৩১ লক্ষ টন চলে যেতে পারে ইথানল তৈরিতে। ফলে প্রকৃত উৎপাদন ২.৮ কোটি টনে আটকে যেতে পারে। অথচ দেশের অভ্যন্তরে বার্ষিক চাহিদা ২ কোটি ৮৩ লক্ষ টন এবং ইতিমধ্যে ৭ লক্ষ টন চিনি বিদেশে রফতানি করা হয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ জোগান ও রফতানি মিলিয়ে চাহিদার তুলনায় জোগান ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
সংস্থাটির হিসেব অনুসারে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ দেশে মজুত চিনির পরিমাণ কমে ৪৩ লক্ষ টনে দাঁড়াতে পারে, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ে ছিল ৫৩ লক্ষ টন।
ভারতে চিনি শিল্পে এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে ইথানল ব্লেন্ডিং প্রকল্পের। চিনিকলগুলি এখন কেবল চিনি উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ইথানলের কাঁচামাল সরবরাহে জোর দিচ্ছে। ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে দেশ ১৯.২৪ শতাংশ ইথানল মিশ্রণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে এবং ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ শতাংশ। ইথানল উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং এতে চিনির ব্যবহার বেশি হয়ে মুনাফা বেশি আসায় মিলগুলি আয়ের নতুন পথ বেছে নিয়েছে।
Advertisement