দার্জিলিংয়ের সিটং-এ হানিমুনে গিয়ে হোম-স্টেতে বারবিকিউয়ের আগুনে ভয়াবহভাবে দগ্ধ হলেন নববধু। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আশঙ্কাজনক তরুণী।

এই ঘটনা প্রসঙ্গে দার্জিলিংয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) ওয়াই জগন্নাথ রাও জানিয়েছেন যে, ওই মহিলার শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছে এবং বর্তমানে তাঁর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। ইতিমধ্যেই হোম-স্টে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। আগুন লাগার সময় ঠিক কী ধরনের দাহ্য পদার্থ ঢালা হয়েছিল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
জানা গিয়েছে, ওই অগ্নিদগ্ধ গৃহবধূর নাম নিকিতা সাহা (দাস)। বর্তমানে তিনি শিলিগুড়ির সেবক রোডের দিসান নার্সিংহোমে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকরাও জানিয়েছেন যে তাঁর শরীরের ৬০ শতাংশ ঝলসে গিয়েছে। এদিন চোখের সামনে স্ত্রীকে জ্বলতে দেখে তাঁকে রক্ষা করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বামী সমীর দাস (সৌভিক), যার ফলে তিনিও আংশিক দগ্ধ হন। পাহাড়ের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর অগ্নিনির্বাপণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এই ঘটনার পর তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কার্শিয়াং থানার পুলিশ ঘটনার বিস্তারিত তদন্তভার গ্রহণ করেছে।
নিকিতার মামা তাপস কুমার দাস এই মর্মান্তিক পরিণতির জন্য সম্পূর্ণভাবে হোম-স্টের গাফিলতিকে দায়ী করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, কোনওরকম সঠিক পদ্ধতি বা ব্যবস্থা ছাড়াই সেখানে বনফায়ারের আয়োজন করা হয়েছিল। দুর্ঘটনার পর নিকিতা ও সমীর দীর্ঘক্ষণ সেখানে পড়ে থাকলেও হোম-স্টে কর্তৃপক্ষ কোনওপ্রকার সাহায্য করেনি বলে তাঁর দাবি।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া বাজার এলাকার বাসিন্দা সমীর এবং নিকিতার মাত্র দুই মাস আগে ভালোবেসে বিয়ে হয়। বিয়ের পর এটাই ছিল তাঁদের একসঙ্গে প্রথম ঘুরতে যাওয়া। দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণ করতে কয়েকদিন আগেই তাঁরা সিটংয়ের ওই হোম-স্টেতে এসে ওঠেন। গত রবিবার রাতে সেই হোম-স্টের চত্বরেই তাঁদের জন্য বারবিকিউয়ের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পাহাড়ের হোম-স্টে বা রিসোর্টগুলোতে এই ধরনের ক্যাম্পফায়ারের ব্যাপক চল থাকলেও, এই দুর্ঘটনা পর্যটকদের জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
জানা যায়, বারবিকিউ তৈরির সময় অসাবধানতার কারণে দাহ্য পদার্থ থেকে আচমকাই আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পাহাড়ি এলাকার ঝোড়ো হাওয়া এবং শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে সেই আগুনের তীব্র শিখা দ্রুত নিকিতাকে গ্রাস করে। সমীর তড়িঘড়ি করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে নিজের হাত পুড়িয়ে ফেলেন, কিন্তু ততক্ষণে নিকিতা ভয়াবহভাবে ঝলসে যান।
দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধার করে প্রথমে তাঁকে স্থানীয় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় রাতেই তাঁকে শিলিগুড়ির সেবক রোডের ওই বেসরকারি নার্সিংহোমে স্থানান্তরিত করতে হয়। সমীরের অভিযোগ, হোম-স্টে কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি ও উদাসীনতার কারণেই এই ঘটনা। সেখানে আগুন নেভানোর মতো ন্যূনতম কোনও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা জরুরি পরিকাঠামো ছিল না। বিপদের সময় কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কোনও সহযোগিতাও মেলেনি। পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য শিলিগুড়িতে পৌঁছতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লেগে যাওয়ায় রোগীর স্থানান্তরের ক্ষেত্রে চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
এই পুরো ঘটনার বিবরণ দিয়ে কার্শিয়াং থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন সমীর। তিনি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই রাতের সিসিটিভি ফুটেজ ইতিমধ্যেই পুলিশের হাতে এসেছে। অগ্নিকাণ্ডের উৎস ঠিক কী ছিল, বারবিকিউতে অতিরিক্ত কোনও দাহ্য তরল ব্যবহার করা হয়েছিল কি না এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কার গাফিলতি ছিল, তা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
Advertisement