আসন্ন নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনের আগে নতুন নাম ও প্রতীক পেল মমতা এবং ঋতব্রত শিবির। জানুন রাজ্য রাজনীতির সমস্ত প্রতিক্রিয়া।

দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান পরিচিতি ছিল ঘাসের উপর জোড়াফুল। তবে আসন্ন উপনির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচন কমিশন সেই প্রতীক ও দলের নাম ফ্রিজ করে দিয়েছে। এর ফলে বিভক্ত তৃণমূলের দুই শিবিরকেই সম্পূর্ণ নতুন নাম এবং চিহ্ন নিয়ে নির্বাচনী ময়দানে অবতীর্ণ হতে হচ্ছে।
মাসপাঁচেক আগে বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের ভোটাররা তৃণমূলকে প্রত্যাখ্যান করেন। শাসক থেকে বিরোধী আসনে বসার পরই দলের অন্দরে ভাঙন তীব্র হয়। দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়কের সমর্থন নিয়ে বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত হন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের জেলা ও রাজ্য স্তরের একাধিক হেভিওয়েট নেতা তাঁর শিবিরে যোগ দেন। পরবর্তীতে অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান করে জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক করে ঋতব্রত শিবির নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি জানায়। দু’পক্ষের দাবিদাওয়া শোনার পর শুক্রবার রাতে কমিশনের তরফ থেকে মূল দলের নাম ও প্রতীক ফ্রিজ করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
জানা গিয়েছে, দুই শিবিরের জমা দেওয়া প্রস্তাবের ভিত্তিতে কমিশন নতুন নাম ও চিহ্নে অনুমোদন দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের নতুন নাম হয়েছে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং তাদের প্রতীক ‘ফুটবল খেলোয়াড়’। অন্যদিকে, ঋতব্রত শিবিরের নাম দেওয়া হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’, যার প্রতীক ‘খাম’। এদিন সকালে ঋতব্রত শিবিরের জাতীয় কর্মসমিতির জুম বৈঠকে ‘জাতীয়তাবাদী তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’-এর মতো নাম এবং ‘ব্ল্যাক বোর্ড’, ‘খাম’ ও ‘টর্চ’-এর মতো বিকল্প প্রতীক নিয়ে আলোচনা হয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্রের খবর, ‘পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেস’ নামটির বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল, তবে পরে তা বাতিল করা হয়।
আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনে এই নতুন পরিচয়েই লড়তে হবে দুই পক্ষকে। যদিও ইতিমধ্যেই নন্দীগ্রাম থেকে প্রার্থী প্রত্যাহার করে কংগ্রেসকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করেছে মমতা শিবির। রেজিনগরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে। তবে নতুন প্রতীক ‘খাম’ নিয়ে উপনির্বাচনের আগেই তৈরি হয়েছে তীব্র ধোঁয়াশা। কারণ, নন্দীগ্রামে আইএসএফ প্রার্থীর প্রতীকও ‘খাম’। ফলে আইএসএফ-এর প্রতীকের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
পুরো পরিস্থিতি নিয়ে মমতা-শিবিরের নেতা কুণাল ঘোষ জানান, দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামটাই তাঁদের আসল প্রতীক এবং মানুষ তাঁর ওপরই আস্থা রাখবেন। তিনি আরও বলেন, "খেলা হবে।" অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম হিসেবে তাঁদের তৃতীয় পছন্দ হলেও, ‘খাম’ প্রতীকটি প্রথম পছন্দ ছিল। কাল্টের বিরুদ্ধে তাঁদের এই লড়াইয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মানুষের হাতেই।
এই প্রসঙ্গে কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, নিয়ম মেনেই কমিশন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের দল ধরে রাখতে পারেননি, তার দায় কোনোভাবেই বিজেপির নয়।
একই সুরে আমজনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান বিধায়ক হুমায়ুন কবীর কটাক্ষ করে জানান, বিধানসভা ভোটের পর দলের এই পরিণতি প্রত্যাশিতই ছিল এবং মমতা নিজেই নিজের দলকে শেষ করেছেন।
বিজেপি নেতা অনুপম ঘোষ বিষয়টিকে ‘প্রতীক-প্রতীক খেলা’ বলে কটাক্ষ করেছেন। তিনি জানান, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে মানুষ বিজেপিকে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার দায়িত্ব দিয়েছে। আগামী ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনেও মানুষ ডাবল ইঞ্জিন সরকারের উন্নয়নের পক্ষেই ভোট দেবেন।
অন্যদিকে, সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন বিজেপির অঙ্গুলিহেলনে কাজ করছে। শিবসেনা বা এনসিপি-র মতোই বিরোধী দলগুলোকে শেষ করতে চাইছে বিজেপি। তবে তৃণমূল যে নিজেদের মধ্যেই বিভাজন করেছে, সে কথাও তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন।
Advertisement