জলপাইগুড়ির নাগরাকাটায় ফের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে হাতির মৃত্যু। উত্তরবঙ্গে অবৈধ বিদ্যুতের বেড়ায় বারবার হাতির মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বন দফতরের...

দীর্ঘদিন ধরেই আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ি জেলার জঙ্গল সংলগ্ন কৃষিজমিগুলোতে ফসল বাঁচাতে বেআইনিভাবে বৈদ্যুতিক তারের বেড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বন দফতরের তরফ থেকে লাগাতার সচেতনতা প্রচার সত্ত্বেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এর আগেও কৃষিজমিতে এই ধরনের অবৈধ তারের সংস্পর্শে এসে বহু হাতির মৃত্যু হয়েছে। ফলে নাগরাকাটার সুখানী বস্তির এই সাম্প্রতিক ঘটনা আবারও বন দফতরের নজরদারি এবং অবৈধ তার লাগানো আটকানোর ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোর দিকে চোখ রাখলে দেখা যাবে, উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অংশে হাতির মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঘটনা। চলতি বছরের ১৭ জুন আলিপুরদুয়ার জেলার জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন কলাবাড়িয়া এলাকায় একটি পূর্ণবয়স্ক দাঁতাল মারা যায়। প্রথমে বজ্রপাত বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার সন্দেহ থাকলেও, ময়নাতদন্তের পর বিদ্যুতের শকেই মৃত্যুর বিষয়টি জানানো হয়। এরপর ২ জুলাই আলিপুরদুয়ারেরই বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের পূর্ব বিভাগের ভলকা রেঞ্জে আরও একটি দাঁতালের মৃতদেহ মেলে। সেখানেও বন দফতরের প্রাথমিক তদন্তে বৈদ্যুতিক তারকেই দায়ী করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ৬ আগস্ট আলিপুরদুয়ারের ফালাকাটা ব্লকের ময়রাডাঙা পঞ্চায়েতের তালুকেরটারি এলাকার একটি ধানখেত থেকেও এক পূর্ণবয়স্ক দাঁতালের দেহ উদ্ধার হয়।
অক্টোবর মাসেও এই মৃত্যুমিছিল থামেনি। ২ অক্টোবর জলপাইগুড়ির মণ্ডাবাড়ি এলাকায় একটি হাতির মৃতদেহ উদ্ধারের খবর সামনে আসে। জমির চারপাশে অবৈধভাবে বিদ্যুতের সংযোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার কাজ শুরু করে বিদ্যুৎ ও বন দফতর। ওই একই সময়ে জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর বনাঞ্চল সংলগ্ন নোধাবাড়ি এলাকাতেও একটি হাতির মৃত্যু হয়। সেখানে হাতির শুঁড়ে তার পেঁচানো থাকার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন বনকর্মীরা।
গত ৬ অক্টোবর রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ ওরাঁও জানান, বিগত চার মাসে রাজ্যে অবৈধ বৈদ্যুতিক তারের কারণে মোট সাতটি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনিতে তিনটি এবং উত্তরবঙ্গে চারটি ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়। উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রগুলির মধ্যে আলিপুরদুয়ারের শালকুমারহাট, কুমারগ্রাম, ফালাকাটার তালুকেরটারি এবং জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে গত তিন মাসে আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়িতে ঠিক কতগুলি হাতি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গিয়েছে, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন ঘটনায় প্রাথমিক অনুমান হিসেবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার কথা বলা হলেও, সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ্যে এসেছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। বারবার প্রচার সত্ত্বেও কেন জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় অবৈধ বিদ্যুৎসংযোগ করে ফসল বাঁচানোর প্রবণতা বন্ধ করা যাচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বন্যপ্রাণীদের মৃত্যু ঠেকাতে অবিলম্বে অবৈধ বিদ্যুৎসংযোগ চিহ্নিত করা, নিয়মিত নজরদারি চালানো এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে।
Advertisement